রাত 12 টায় যখন ঘুম আসছে না আর পাহাড়ের জন্য একটা অসাধারন আকর্ষণ অনুভব করছিলাম, তখন হাতে মোবাইল নিয়ে কিছু হিজিবিজি লেখার চেষ্টা 🙂🙂…..
অনেকদিন ধরেই ভেতরে ভেতরে এক অদ্ভুত ইচ্ছে জন্ম নিচ্ছে – যদি একটু হারিয়ে যেতে পারতাম! এই গতানুগতিক জীবনের ফাঁদ আর নানারকম প্রফেশনাল চাপের ভেতর যেন ধীরে ধীরে জীবনের রঙ ফিকে হয়ে যাচ্ছে। কোথাও যেন সেই চেনা স্বাদ, সেই চেনা প্রাণচাঞ্চল্য হারিয়ে ফেলেছি।
পরপর দু’বছর ট্রেকিংয়ে যেতে পারিনি – এটাই হয়তো সবচেয়ে বড় প্রমাণ যে জীবনের ছোট ছোট খুশির মুহূর্তগুলো আজকাল প্রফেশনাল রেসপনসিবিলিটির কাছে হেরে যাচ্ছে। কিন্তু মন তো আর মানতে চায় না। একটা সময় ছিল, যখন এই ডাক মানে ছিল ট্রেকিং ব্যাগ গোছানো, হেডল্যাম্পের ব্যাটারি চেক করা আর টিকিট করা। আজ সেই ডাক টাকে কেবল অনুভব করছি।
পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে মাথাটা পেছন দিকে হেলিয়ে শিখরের দিকে তাকিয়ে থাকা – ওই অনুভূতিটা ভাষায় বোঝানো যায় না, শুধু অনুভব করা যায়। আর আমি সেই অনুভূতি থেকে দু’বছর ধরে বিচ্ছিন্ন।
রাত এখন ১২টা। শুয়ে পড়েছিলাম। কাল সকালে আবার Chennai Hyderabad ট্যুর। ব্যাগ গুছোনো আছে, প্ল্যান করা আছে – সবই নিয়মমাফিক। কিন্তু তবুও একটা অদ্ভুত খেয়াল আমাকে শুতে দিচ্ছে না। মনে হচ্ছে, যদি আবার একবার হারিয়ে যেতে পারি!
হারিয়ে যেতে চাই এই শহরের কোলাহল থেকে, এই ট্র্যাফিক সিগন্যাল আর গাড়ির হর্নের শব্দ থেকে, দিনের পর দিন চলতে থাকা মিটিং আর ডেডলাইনের বোঝা থেকে, চারপাশের অবিরাম ভিড় থেকে, জীবনের সাজানো ডিসিপ্লিন আর দায়িত্বের পরিধি থেকে – সবকিছু থেকে।
জাস্ট কয়েকটা দিনের জন্য। জায়গাটা হোক একেবারে একাকিত্বের, যেখানে আমি আর আমার ভেতরের আমি ছাড়া আর কেউ থাকবে না। শুধু নির্জনতা, পাহাড়ের ঠাণ্ডা হাওয়া, আর একফালি নীরবতা – যেখানে হারিয়ে গিয়ে নিজের ভেতরের কথাগুলোকে আবার নতুন করে শুনতে পারি।
বড় হতে হতে আমরা শিখে যাই যে জীবন মানে দায়িত্ব। ছোটবেলায় ভাবতাম বড়রা বড় হয়েই বুঝি এমন গম্ভীর হয়ে যায়। এখন বুঝি, গম্ভীরতা তাদের বেছে নেওয়া কোনো চেহারা নয়, বরং জীবনের চাপে গড়ে ওঠা এক মুখোশ।
সকাল ৭টার অ্যালার্ম বেজে ওঠে। চোখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে মেসেজের বন্যা – “Please revert ASAP”, “Client call at 11”, “Have you checked the mail?” দিনের পর দিন এভাবেই চলে। রাত ১২টায় ক্লান্ত শরীরে শুতে যাওয়ার পরও যেন সেই চাপ ঘাড় থেকে নামে না।
এখন মনে হয় আমাদের জীবন কি শুধুই এই দৌড়? অফিস, প্রফেশনাল সাফল্য, সামাজিক দায়িত্ব – এগুলো কি সত্যিই আমাদের কাছে শান্তি নিয়ে আসে? নাকি এগুলোই আমাদের কাছ থেকে চুরি করে নিচ্ছে সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো, যেখানে আমরা নিঃশ্বাস নিতে পারি?
মানুষ ভাবে একাকিত্ব মানেই একা থাকা, ভয়ঙ্কর শূন্যতা। কিন্তু আমি বলি একাকিত্ব মানে নিজের কাছে ফিরে আসা।
সেই আমি-কে খুঁজে পেতে চাই। তার জন্য চাই না কোনো বিলাসবহুল রিসর্ট, কোনো ছুটির প্যাকেজ। চাই একটি নামহীন গ্রাম, পাহাড়ের কোলে ছোট্ট একটি কাঠের কুঁড়েঘর, বাইরে ঝরনার শব্দ, আর চারপাশে সেই অদ্ভুত নীরবতা। সেখানে আমি ফোন বন্ধ করে রাখব। কোনো ইনবক্স খুলব না। কোনো ক্লায়েন্ট কল ধরব না। শুধু বসে থাকব পাহাড়ের গায়ে। শ্বাস নেব ধীরে ধীরে। প্রতিটি শ্বাস যেন আমাকে আবার ফিরিয়ে দেবে সেই ফেলে আসা আমি-কে।
প্রকৃতি বারবার আমাদের ডাকে। আমরা শুনতে পাই না। হয়তো শুনেও অজুহাত খুঁজি – “ছুটি নেই”, “সময় নেই”, “এখন কাজের চাপ বেশি”। অথচ প্রকৃতি জানে, এই সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী। একদিন সেই প্রকৃতির কাছেই তো আমাদের ফিরতে হবে।
সেই ফেরার আগে যদি কয়েকটা দিনের জন্য হারিয়ে যাই?
যদি আমি চলে যাই সেই অচেনা পথে – যেখানে সকাল হবে পাখির ডাকে, দুপুর কাটবে নীরবতার সান্নিধ্যে, সন্ধ্যা নামবে পাহাড়ের ঢালে সূর্যাস্তের আলোর সাথে। আর রাত? রাত হবে একেবারে ভিন্ন। আকাশজুড়ে তারার মেলা, আর আমি বসে থাকব কুয়াশার চাদর গায়ে জড়িয়ে।
এখনো জানি না, কাল আমি Chennai-Hyderabad যাবো, নাকি রাতের অস্থিরতা আমাকে নিয়ে যাবে কোনো অজানা পাহাড়ের দিকে। হয়তো আবার সকালে নিজেকে সমর্পণ করব দায়িত্বের কাছে আর মাথায় নিচু করে চলবো গতানুগতিক নিয়মের ছকে।
কিন্তু এটা আমি জানি – আমার হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। আর সেই ইচ্ছের গভীরে লুকিয়ে আছে মুক্তির এক সাময়িক ঠিকানা – নিজেকে ফিরে পাওয়ার একটা আশা।