আজ সকালে চায়ের কাপ হাতে একটা খবরে চোখ আটকে গেল। বিসর্জনের সময় যাঁরা প্রতিমা বহন করবেন, তাঁদের পরিচয় নাকি নথিভুক্ত হবে। আর মা দুর্গাকে ছুঁতে পারবেন শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। চা ঠান্ডা হয়ে গেল। আমি জানলার বাইরে তাকিয়ে রইলাম। মনটা কখন যে অনেক বছর পিছনে, ছোটবেলার পাড়ার পুজোয় ফিরে গেল, টেরই পাইনি।

মহালয়ার কয়েক দিন আগে থেকেই আমাদের পাড়ায় একটা অদ্ভুত গন্ধ ভেসে বেড়াত। কাঁচা বাঁশ, নতুন কাপড় আর মাটির গন্ধ। স্কুল থেকে ফিরে ব্যাগটা ছুড়ে ফেলেই ছুটতাম মণ্ডপের দিকে। দেখতাম, কয়েকজন মানুষ সারা দিন বাঁশ বাঁধছেন, কাপড় টাঙাচ্ছেন, তার জুড়ে আলো লাগাচ্ছেন। তাঁদের একজনকে আমরা ডাকতাম রহিম চাচা। তাঁর হাতে একটা লম্বা দড়ি থাকত, আর মুখে থাকত একগাল হাসি। আমরা ছোটরা বাঁশের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিলে বলতেন, “সরে দাঁড়াও খোকা, মায়ের ঘর বানাচ্ছি।”
মায়ের ঘর। কথাটা তিনি এমন ভাবে বলতেন, যেন নিজের বাড়ির কোনও আপনজনের জন্য ঘর তৈরি করছেন। তখন কেউ জিজ্ঞেস করেনি
রহিম চাচা কোন ধর্মের মানুষ। আমরা শুধু জানতাম, তিনি না থাকলে মায়ের ঘর তৈরি হবে না। বড় হয়ে জেনেছি, মায়ের গায়ের যে ঝলমলে গয়না দেখে আমরা মুগ্ধ হই, তার অনেকটাই গড়েন মুসলিম কারিগরেরা। মায়ের শাড়ির সুতো কোন হাতে কাটা হয়েছে, কে সেটা বুনেছেন, আমরা কেউ জানি না। কোনও দিন জানতে চাইওনি। অষ্টমীর সকালে অঞ্জলি দিতে গিয়ে প্রতিমার দিকে তাকিয়ে শুধু ভেবেছি, আজ মাকে কী সুন্দর লাগছে।
তারপর আসত দশমী।
সিঁদুরখেলার পর ঢাকের বোল বদলে যেত। সেই আওয়াজে আর আনন্দ থাকত না, থাকত একটা চাপা কান্না। ঠাকুর লরিতে উঠত। আমরা পিছন পিছন হাঁটতাম ঘাট পর্যন্ত।
ঘাটের সেই সন্ধেটা আজও চোখে ভাসে। জলের ধারে একসঙ্গে অনেকগুলো হাত প্রতিমাকে ধরে আছে। কাদায় পা পিছলে যাচ্ছে, কেউ চেঁচিয়ে বলছে “সাবধানে!”, কেউ বলছে “আর একটু!”। সেই ভিড়ে কে হিন্দু, কে মুসলমান, কে কোন জাতের, কেউ খোঁজ রাখেনি। সবাই শুধু চাইছিল মা যেন যত্নে, সম্মানে জলে নামেন। সেই মুহূর্তে প্রতিটা হাতই ছিল একটা মেয়েকে বিদায় দেওয়া পরিবারের হাত।
আজ সকালের খবরটা পড়ে তাই নিজেকে প্রশ্ন করছি। এটা রাজনীতির প্রশ্ন নয়। এটা নিজের ধর্মকে বোঝার প্রশ্ন। কে ঠিক করবেন, কার ভক্তি খাঁটি? জন্ম দিয়ে কি ভালোবাসা মাপা যায়?
ছোটবেলায় ঠাকুমার মুখে রামায়ণ-মহাভারতের যে গল্পগুলো শুনেছিলাম, এই প্রশ্নের উত্তর আমি সেখানেই পাই।
শবরী বছরের পর বছর রামের পথ চেয়ে বসে ছিলেন। রাম যখন তাঁর আশ্রমে এলেন, তাঁর জাত জিজ্ঞেস করেননি। শবরীর ভালোবাসাটুকুই তাঁর কাছে যথেষ্ট ছিল।
বিদুর জন্মেছিলেন দাসীর গর্ভে। অথচ কুরুসভায় সবাই যখন ক্ষমতার মোহে অন্ধ, অন্যায়ের মুখে সত্য বলার সাহস দেখিয়েছিলেন তিনিই।
ধর্মব্যাধ পেশায় ছিলেন মাংসবিক্রেতা। অথচ এক ব্রাহ্মণ তপস্বী ধর্মের আসল অর্থ শিখেছিলেন তাঁরই কাছে।
যে শাস্ত্রের নামে আজ আমরা মানুষের যোগ্যতা বিচার করতে চাইছি, সেই শাস্ত্রই বারবার শিখিয়েছে মানুষের পরিচয় তার জন্মে নয়। মানুষ
চেনা যায় তার কর্মে, তার মনে, তার ভক্তিতে।
আমি জানি, মণ্ডপ বাঁধা আর প্রতিমা বিসর্জন একই আচার নয়। প্রতিটি পরম্পরার নিজস্ব নিয়ম আছে, আর তাকে সম্মান করতেই হবে। কিন্তু কোনও আচারের নিয়ম মানা এক কথা। জন্ম দিয়ে মানুষের আধ্যাত্মিক মূল্য ঠিক করে দেওয়া সম্পূর্ণ আলাদা কথা। আর কে প্রকৃত ধর্মবিশ্বাসী, তা যাচাই করার দায়িত্ব নিশ্চয়ই পুলিশের নয়।
রহিম চাচা আজ বেঁচে আছেন কি না জানি না। কিন্তু ভাবি, তিনি যদি আজ বিসর্জনের ঘাটে দাঁড়াতেন, আর কেউ তাঁকে বলত, “আপনি মাকে ছুঁতে পারবেন না”, তিনি কী বলতেন? হয়তো কিছুই বলতেন না। চুপ করে একটু পিছিয়ে দাঁড়াতেন। যে মায়ের ঘর তিনি নিজের হাতে বানিয়েছিলেন, সেই মাকে দূর থেকে বিদায় জানাতেন।
আর সেই অপমানটা তাঁর হত না। হত আমাদের। মা দুর্গা আমাদের ঘরের মেয়ে। তিনি আসেন, আমরা আনন্দে ভাসি। তিনি ফিরে যান, বুকটা ভারী হয়ে আসে। তাঁর কাছে আমরা শক্তি চাই, জ্ঞান চাই, ভালো-মন্দ বোঝার বিবেক চাই।
তাহলে তাঁরই সামনে দাঁড়িয়ে অন্য একজন মানুষকে বিচার করার আগে নিজের মনটাকে একবার পরীক্ষা করে দেখা উচিত নয় কি? ঐতিহ্য বাঁচুক, আচার বাঁচুক, পুজোর পবিত্রতা অটুট থাকুক। শুধু ধর্মের নামে মানুষে মানুষে দেওয়াল না উঠুক।
এবারের দশমীতে ঘাটে দাঁড়িয়ে আমি মায়ের কাছে একটাই প্রার্থনা করব।
মা, আমাদের সেই বোধ দাও, যাতে জন্মের অহংকার কোনও দিন ধর্মের চেয়ে বড় হয়ে না ওঠে। 🙏

Hope You Liked The Post ?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.5 / 5. Vote count: 499

No votes so far! Be the first to rate this post.

We are sorry that this post was not useful for you!

Let us improve this post!

Tell us how we can improve this post?

By tripotomaniac

Born at Lumding, a town in Assam, Anirban spent his childhood enjoying the whispering sounds of the woods and trees, cherishing the flora and fauna in places like Dwarband, Masimpur, Burlongfur, Mandardisa. Anirban’s writings reflect his deep love towards nature, people and a culture that we can follow to live by. In Anirban’s words, the golden sunrise, the meadows, the snow-clad tall mountains, the never ending seas, the horizon, the smell of sand and soil, large monuments, the history, the people fascinate him and take him to a different world. And he gives his father all the credit who made him feel, cherish and experience these wonders of Mother Earth. His contributions to travel sites like Tripadvisor has a reader base of over forty thousand as well as in websites like Tripoto, He is an author for Happytrips.com, a Times Travel Magazine. His first poetry collection “Osheemer Daak” – Call of the endless is recently published and available in Amazon, Flipkart. One can follow him at www.facebook.com/anirbandeb or his website https://www.endlessvista.com. His email id is tripotomaniac@gmail.com